Monday, 9 November 2020

বারাকপুর স্টেশন কবিতার পাতা ৫০

 

কবিতার পাতা ৫০

একটি লিটল ম্যাগাজিনের কাছে তার ৫০ তম সংখ্যা আন্তরিক ভালোবাসার ও আনন্দের। বিগত প্রায় এক বছর সময়কাল জুড়ে সপ্তাহের প্রতি রবিবারে 'বারাকপুর স্টেশন পত্রিকা' প্রকাশিত হচ্ছে। পাঠকের কাছ থেকে যে ভালোবাসা, আগ্রহ এবং উৎসাহ পেয়েছি তা অভাবনীয়। সামান্য একটি ফেসবুক পেজের জন্য বেশ কিছু মানুষ প্রতি সপ্তাহে অপেক্ষা করেন একথা ভাবলেও ভালো লাগে। আপনাদের ভালোবাসা এভাবেই পত্রিকার সাথে জড়িয়ে থাকুক। বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা এবং সুস্থ সাহিত্য ও সংস্কৃতির জয় হোক।

সম্পাদক মন্ডলী
রাজদীপ ভট্টাচার্য      সজ্জ্বল দত্ত
ঈশানী রায়চৌধুরী     তারকনাথ মুখোপাধ্যায়
ঝুমা মজুমদার      শুভাশীষ ভট্টাচার্য     জয়া বিশ্বাস




গোলাম রসুলের কবিতা

সে
****
সন্ধ্যায় সে এসেছিল সমুদ্র আর জাহাজ নিয়ে

হাওয়ায় গজিয়ে উঠলো উপকূল

শহরের লাল শিখার নিচে চাঁদের সংরক্ষিত মাঠ
বন্ধুত্বের স্মৃতির মতো অমরত্বের ধার দিয়ে আমরা  ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম নক্ষত্রদের সাথে

গোলাপের প্রহর
আর রাত্রি
সুবর্ণরেখা এঁকে হেঁটে যাচ্ছে  যে মেয়ে
তার পায়ে সপ্তদশ শতাব্দীর ডাঙা

তাকে পৃথিবীর মতো দেখতে

==============================

দ্বিজেন আচার্যের কবিতা

মৃত্যুদন্ড
********
এ দন্ড ফিরিয়ে নাও

কবিকে হত্যা করলে এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে
ভেবে দেখ একদিন পৃথিবীর প্রথম আলোয়
কবিই বলেছিল প্রথম সংলাপ
মৃতজনে দিয়েছিল প্রাণ
কবি মারা গেলে বাতাস বইবে না
ফুটবে না ফুল
মুছে যাবে অন্ধকারে, সভ্যতার ব্যাপক বিস্তার

কবিকে মারবে বলে মুখোমুখি তুলেছ কৃপাণ
কবিও মারতে পারে - তারও আছে শব্দভেদী বান
তবু সে শান্ত ও নির্ভয়
অকারণ রক্তপাত পছন্দ করে না

=============================

প্রবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

একাকী পাঠক
**************
তুমি নদী আনতে গেলে
আমি ভাঙা নৌকো নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে

তুমি কুড়োতে গেলে সবুজ
বসত ছেড়ে উড়ে গেল বনটিয়ার ঝাঁক

তুমি যখন শুদ্ধ বায়ুর খোঁজে গেলে ফের
তোমার আসার আশায় ঋতুগুলো মরে গেল
                                                  অতিমারীর চরে

আমার জন্যে রেখে গেলে নিউনর্মাল সিলেবাস
                                            আইসোলেশন পাঠ....

===============================

মীরা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

সিঁয়াস
********
আলোকে আড়াল করে কালো পর্দা 
ঝুলে আছে সংকেতের মতো।
তুমি কি ওপাশ থেকে ঘরে ঢুকবে?
ওদিকে বারান্দা আর বারান্দায় বুগনভেলিয়া

আত্মহননের আগে কার কথা ভেবেছিলে তুমি
অথবা প্রত্যক্ষভাবে  আমিই কি....

বাইরে বৃষ্টি নামলো 
আমার আঙ্গুল কাঁপছে , নরম মোমের আলো
গলে যাচ্ছে তীব্র দোলাচলে।
কুন্ঠিত পায়ের শব্দ আগে হয়তো খেয়ালও করিনি
আজ কান পেতে আছি। 
ভিজে যাচ্ছে  বুগনভেলিয়া 

==============================

ফটিক চৌধুরীর কবিতা

একটু একটু করে
****************
নিজের পেশাকে একটু একটু করে
পেশি শক্তির সাহায্যে বেশি
নির্ভর করে তুলি
লেখার নেশাকে একটু একটু করে
ধৈর্য শক্তির সাহায্যে বেশি
নির্ভার করে তুলি।

==============================

তৃষ্ণা বসাকের কবিতা

মৃতদের কার্নিভাল
*******************
এসো কার্নিভাল এসো,
ময়ূর পাখাটি পিঠে বেঁধে নিয়ে এসো
চাঁদ ভেসে যায় গঙ্গাজলে...
পরপর নাচ আসে,
শক্তি সংঘ, আমরা কজন,
সিঁদুর ও নাচ হয়,
তেল মুখ, তেল-তেল মুখ
তেল হাসি, তেল-তেল হাসি
বসে দেখে,
এসো কার্নিভাল এসো, লাশ-নৃত্য হোক,
চাঁদ ভেসে যায়  গঙ্গাজলে...
ঘটের সরল ডালপালা
নিজেরা নিজেকে খায়,
অটোফাজি,
পাঝাড়ার পাজি!
আমি দীর্ঘ হাত দিয়ে লেবু পাড়ি,
বহুদিন আগে, গ্রামসুদ্ধ মরে গেছে,
শহরের ট্রেন, জানেনি সেসব গূঢ়,
ভুল করে থেমে যায় আজও,
নীল প্লাটফর্ম ধরে
হেঁটে আসে
মৃত মানুষের এই গ্রামে!
 
==============================

রবীন বসুর কবিতা

কবিতার অনন্ত যাত্রা
*******************
কবিতার প্রসন্ন হাত আজ বড় মলিন
সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী,ভাইরাস আতঙ্কে কাঁপে দেশ
মৃত্যু সে তো অক্ষরের সীমানা অতিক্রম করে
ছন্দের কৌমার্য খেয়ে অলংকারে বৈধব্য আনে! 

নিপাট গদ্য থেকে যে অগ্নি সর্বভুক
জন্মান্তর পার হয়ে বাংলা কবিতার পুনর্জন্ম দ্যাখে :
তাকে পাশে বসিয়ে শঙ্খ ঘোষ ক্লাস নেন
শক্তি তখন পোড়াকাঠ নিয়ে উন্মাদ… 

তরুণ কবির কাঁধে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সময়
মাস্ক পরিহিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে 
কবিতা এখন সংক্রমণ মুক্ত হবে… কেননা, সভ্যতা তার ঘাড়ে পা রেখে অনন্ত যাত্রায়… 

==============================

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

কুয়াশা রাতের পরিধি জুড়ে
*************************
এইভাবেই একদিন আমাদের দেখা হবে
গাছ থেকে সব জল ঝরে গেলে
শীতের ভোরে পুকুরের জলে
পাতলা সরের মতো নেমে আসবে সন্ধে
পাখির ডাকের আচ্ছাদন থেকে আমরা
কয়েক হাজার ক্রোশ দূরে চলে গেছি
ফিরে যে আসা যায় তার কোনো পদছাপ 
আমাদের কেউ কখনও দেখায় নি 
বিকেলের বৈশাখী আঁচলে

এখানে অন্ধকার ভাঙে না
কুয়াশা সন্ধের আবছা চৌকাঠ পেরিয়ে
যে কটা পা দোকানের হাতল পর্যন্ত পৌঁছে যায়
শুধুমাত্র সিলভারের চাকতি মাথায় না থাকায়
তাদের দাঁড়াতে না দিয়ে আরও দূরে ঠেলে দেয়

কুয়াশা রাতের পরিধি জুড়ে 
কিছু চারাগাছ নামতা পড়ার সুরে শরীর দুলিয়ে
জল কোলাহলের গায়েই জেগে উঠছে

এবার আমাদের দেখা হোক ।

=============================

রঞ্জনা ভট্টাচার্য্যের কবিতা

ঝুরো  বাতাস
*************
অপলক দৃষ্টিতে তাকাবো বলে
তপস্যাভূমিতে মিলন চেয়েছিলাম;
কোনো আলিঙ্গন ছাড়াই আমার অপরিচিত এই দেহে দিয়েছি পেরেকের আনন্দ,
কফিনে শেষ পেরেক ঠুকতে  গিয়ে_
দুটো ডালভাতের সংস্থান দিয়েছি শরীরকে এর  বেশি কিছু চাইতে গেলে পাঁজরকে খাঁচা বানাতে হয়,
সেখানে রাখতে হয় একটা ছোট ফাঁক --
আসবো আর যাবো, যাবো আর আসবো,
ঠিক ঝুরো বাতাসের মতো।

==============================

সুস্মিতা গোস্বামী সরকারের কবিতা

নিঃশেষ
*********
মিছে ডাক দাও কেন?
ফুরিয়ে যাবার অভিমান শুধু তোমার  একার নয়।
তিলেক  ফারাকে  যবে বিষ তুলে দিলে নিঃশ্বাসে..
ক্রমে ক্রমে দূরে সোহাগী স্বপ্নের সমর্থ লীলা..
অনন্ত ঘোলা গাঙে মেটে পাত্রে মাটি হবো বলে!
সেদিন থেকেই ক্ষয় বুকের সুবাস, চন্দনের মত!
আরও কাছে থেকে যাবো বলে..
গাঢ় অনুযোগ কাজলের মেকি সংলাপ, লাস্যের ঢেউ ঠেলে..
স্বাগত তোমায় আমার আত্মজন..!
বিপ্রতীপ ঝড় তোমাকে অন্ধ করে.. আমি সন্নিহিতের হাত বাড়িয়েছি...
অনুরাগ সুরে সুরে বিবাগী বাতাস হবো বলে..!

================================

দেবাশিস তেওয়ারীর কবিতা

মিঠি
******
মিষ্টি মিঠি ছড়িয়ে আছে জলে
তোমরা যারা সদলবলে
                        জলের মধ্যে নাইতে গেলে
মিষ্টি দুটো চোখ
বাড়িয়ে দিল দু'খানি পা----জলের সম্ভোগ
একটিমাত্র ঝোঁক
দূরে দেখছে আগুন তেজে
                                     গনগনে ওর চোখ
সে-কী ভীষণ রোখ
মিঠির গায়ের বাকল থেকে দু'একপশলা মায়া 
খেলিয়ে দিল আলোর মধ্যে ছায়া

সেই ছায়াতেই দাঁড়িয়ে থাকা গুষ্টিকয়েক লোক
দেখতে পাচ্ছে মিষ্টি মিঠির
                                      গনগনে দুই চোখ

=============================

দেবাশিস ঘোষের কবিতা

ফেলে দেওয়া এক ঝড়ের কথা
*****************************
আমি এক ঝড়ের সন্ধ্যা ফেলে এসেছি আপনার ছাদে
তবুও আপনি আমায় কিছুই বলেন নি
আমি এক আগুনখেকো উদ্ভিদ কাঁধে হেঁটেছি দু'হাজার রোদ্দুর
তবুও ভোর ফুটে ওঠেনি সন্ধ্যা তারা হয়ে
আমার শরীর জুড়ে হাজার হাজার টন অবসন্নতা
ঝেড়ে ফেলার মতো জায়গা পাইনি কোত্থাও
চারিদিকে এতসব পুতুলের মুখে আশ্চর্যজনকভাবে
শিরা উপশিরা ভর্তি রক্ত মাংস রয়েছে এখনো
আমি সব পাথর চিনেছি, উপত্যকা আর নুন চিনেছি
বড় কষ্ট হচ্ছে পিঠের উপর এক জ্বলন্ত তারা বয়ে চলা
পুড়ে যাচ্ছে চামড়া, মুখ, আর অবশিষ্ট চুল
এতসব সয়ে সয়ে হেঁটে চলেছি শুধু দেখব বলে
সেই ঝড় এতদিনে কতটুকু বেড়ে উঠেছে

==============================

অসিত মন্ডলের কবিতা

মায়াবী বিকেল
****************
মনখারাপী অক্ষর দিয়ে অপেক্ষার নাম রেখেছিলাম শূন্যতা
এক মায়াবী বিকেল সে নাম মুছে দিল অনায়াসে
কাল রাতে ঘুম আসে নি দুচোখের পাতায়
টুকরো টুকরো করে আকাশের চাঁদ ছিঁড়েছি সারারাত নিজস্ব ওয়াশরুমে
একটা সুগন্ধি বিকেল আমাকে চেনালো ভালোবাসার দেশ
হলুদ বাসন্তী আদর
পরিষেবা সীমার বাইরে থাকা মুঠোফোনও জীবন্ত হলো
ভালোবাসাও এক পর্যটন
কাছে কিংবা দূরের অনির্দিষ্ট গন্তব্যে
এজন্য লাগে সুচারু ট্যুর প্ল্যানিং
গুগল সার্চ অগ্রিম বুকিং পরিপাটি প্যাকিং
যাত্রা শুরুর আগে নির্ঘুম উদ্বেগ
এক অতলান্ত বিকেলে আমি পরে নেব ডুবুরির পোশাক

===============================

ভগীরথ সর্দারের কবিতা

দূর থেকে
***********
দুপুর হলে গাছেদের ঘুঙুর বেজে ওঠে, শাখায়–পাতায়
গানের সুরটুকু কখনো নদী , কখনো ঝরনা হয়ে বয়ে চলে খাদে

পাহাড় সমান দুঃখ জমাট বাঁধা বুক
সেই বুকের বাঁ–পাশ দিয়ে একটা জাহাজ চলে যায় ৷

আমি দূর থেকে তাকে বন্দরের রাস্তা দেখিয়ে দিই
আমি দূর থেকে তাকে টা -টা করে দিই ৷

=================================

বিশ্বজিৎ- এর কবিতা

মূর্খের গান
************
প্রতিদিন নিঃস্ব হই
প্রতিদিন আলো আসে ঘরে।
এভাবে মরতে মরতে
কাগজ, কালি ফুরায়

কখনও তুমি ফুরোয় না...

=============================

গৌতম বাড়ই-এর কবিতা

সিরিয়াল কবিতা
*****************
মৃত মানুষ আকাশের গায় আলো খোঁটে
পেড্রো লোপেজ কশাইকে মাপছিলো
পশু জবাই তো ছেলেখেলা!
তিনশো নগ্ন নারী কেটেছিস? মাখনের মতন
কলম্বিয়ান আবহাওয়ায়
উন্মাদ নিরুদ্দেশের গল্প ছিল

=============================

অশোক অধিকারীর কবিতা

হাত পাখা
**********
শীতলতা ফিরিয়ে নিয়ে কবোষ্ণ হও
শতরঞ্জি রঙের পোশাকে পুঁতির সাজ
অত হাওয়া লুকানো প্রলেতারিয়েত বুকে
লাইনে দাঁড়িয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছে
পাঁজরের হাড়খণ্ডে দলিত জানালা তার
বুকের বোতাম হাট করে খোলা

=============================

সুতনু হালদারের কবিতা

বাসা
******
এরপর বানান নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি শুরু হ'ল

দুই পক্ষই যুযুধান
এক পক্ষের খেলোয়াড় স্বয়ং স্বরবর্ণ
অন্যপক্ষে ব্যঞ্জনবর্ণ

এক্ষেত্রে আলাদা করে বর্ণভেদের প্রয়োজন নেই

ইতিহাস আর মাকড়সা
নিজেদের জালকেই বাসা ভাবে

=============================

ঐন্দ্রিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

মায়া
******
চেয়ে দেখ! কতবার সাজিয়েছ এই পৃথিবীকে ফেলে আসা স্মৃতি দিয়ে। পেরিয়েছ জোনাকির মতো আলো-আঁধারি রূপকথার মায়াজাল। ভাঙা মেঘে তারাখসা রাত, চাঁদ দেখার প্রতিশ্রুতি, কোনোকিছুই শেষ হয়ে যায়নি, আজও...

=============================

No comments:

Post a Comment